বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ক্বারী ওবায়দুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ)


তার অবদান ও গৌরবময় কর্ম জীবনঃ
- ছাঈদ কোদালাভী

তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়ার কোদালা ইউনিয়নের একটি সম্ভ্রান্ত দ্বীনদার পরিবারে ১৯৪৪ সালের ১লা জানুয়ারী জন্ম গ্রহন করেন, পিতা যুগশ্রেষ্ট আলেম, অলিকুল শিরূমনি পীরে কামেল আলহাজ্ব, আল্লামা শাহ মেহেরুজ্জামান ইসলামাবাদী রহঃ।
ক্বারী উবায়দুল্লাহ ছোট বেলা থেকেই এলাকার মাদরাসা-মসজিদ, পাশ্ববর্তী মহল্লার ওয়াজ-মাহফিল, উৎসব-সমাবেশ-সম্মেলনে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। ধীরে ধীরে তিনি সুললিত কন্ঠের ক্বারী হিসেবে পরিচিতি ও অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করতে লাগলেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন মাদরাসা-মসজিদ, ওয়াজ-মাহফিল, উৎসব-সভা- সেমিনার, সমাবেশ-সম্মেলনে কুরআন তেলাওয়াতের জন্য আয়োজকরা তাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ করতেন। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সুমধুর কন্ঠ ও সূরের মাধ্যমে বিশুদ্ধ তেলাওয়াত উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে অগণিত শ্রেুাতা-দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানসহ নানা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ করা হতো কুরআন তেলাওয়াতের জন্য।ক্বারী উবায়দুল্লাহ ছোট বেলায় তার পিতার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর রাজধানীর লালবাগ মাদরাসায় ভর্তি হন, সেখানে তিনি হাফেজ্জী হুজুর (রাহ.) এবং পরবর্তীতে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের (রাহ.) এর কাছে বুখারী শরীফ সহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি তাকমীল পাশ করলে শায়খুল হাদীস তাকে লালবাগ মাদরাসাতেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বোখারী শরিফ পড়ানোর দায়িত্ব দেন। ওই বছরই মাত্র ১৮ বছর বয়সে নাজিমুদ্দিন রোডে অবস্থিত রেডিও পাকিস্তান কেন্দ্রে প্রথম কোরআন তেলাওয়াত করেন ক্বারী উবায়দুল্লাহ।
ক্বারী উবায়দুল্লাহ ১৯৬২ সাল থেকে ঐতিহ্যবাহী চকবাজার শাহী মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর থেকে নামাজ পড়াতে না পারলেও তাকে নিয়মিত সম্মানী দিয়ে যাচ্ছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত কারী উবায়দুল্লাহর সুমধুর কন্ঠের আযান এবং তিলাওয়াত শুনেননি এমন মানুষ বাংলাদেশে সম্ভবত একজনও পাওয়া দুষ্কর! যিনি যাদুকরি কন্ঠে বিশুদ্ধ তিলাওয়াতে কুরআনের মাধ্যমে লাখ-লাখ শ্রেুাতাদের মোহিত করেছে তিনি আজ ৯ বছর ধরে অসুস্থাবস্থায় দিনাতিপাত করছেন।

কুরআনুল কারীমের শিল্পী, অসংখ্য মানুষ গড়ার কারিগর, এদেশের হাজারো আলেম, ক্বারীর উস্তাদ মাওলানা ক্বারী উবায়দুল্লাহকে দেখার আজ কেউ নেই! আমরা কত বড় নিমক হারাম! আমরা গুণীদের কদর করতে জানি না। আর ‘যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণী জন্মে না’। এই কথাটি এভাবে বললে আমাদের জন্য বেশি উপযোগী হয় তা হলো, ‘যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণীরা থাকে না’। আমাদের দেশে কুরআনের ক্বারী, হাফেজে কুরআন এবং ইসলামী স্কলারদের কদর করা হয় না। জীবদ্দশায় যেভাবে না, তেমনি মরণের পরও না।

গানের শিল্পীদের যেভাবে মুল্যায়ণ করা হয় তাদের জীবদ্দশায়, তেমনি মৃত্যুর পরও। বামপন্থি লেখক-সাহিত্যিক-নাস্তিকদের বেলায় সরকারের আন্তরিকতায় শেষ নেই! কুরআনের ক্বারী, বিজ্ঞ আলেম, ইসলামী সাহিত্যিক, হাফেজে কুরআন এবং ইসলামী স্কলারদের বেলায়ই শুধু সরকারের পৃষ্টপোষকতার অভাব। এটা আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের জন্য বড় দুর্ভাগ্য! সে দুঃখটা আমাদের কোনো দিন ঘুচবে কি?
আমাদের আর একটি অদ্ভুত প্রবণতা হলো জীবিতাবস্থায় কোনো গুণীর কদর না করলেও মৃত্যুর পর তাঁর জন্য প্রশংসার ও আবেগের বন্যায় ভাসিয়ে দিই। তাঁকে তখন আমরা কত না অভিধায় বিভূষিত করি, কত মরণোত্তর পুরস্কারে অভিষিক্ত করি। কিন্তু বেঁচে থাকতে হয়তো কোনো দিন তার খোঁজ খবরই কেউ নেয়নি, কিংবা সুনামের পরিবর্তে তাকে বদনামের কালিমাতে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। এধরণের ভন্ডামিতে আমরা খুবই এগিয়ে। আর সে জন্যই প্রতিভাবানদেরকে বেশি দিন আমরা কাছে পাই না, বা ধরে রাখতে পারি ন। কেননা প্রতিভা এমনই একটা বিষয় যার পৃষ্টপোষকতা দরকার, অন্যথায় সে অনুকুল স্থানই খুঁজে নেয়।

গুণী কাকে বলে? ভালো গায়ক হলে তিনি গুণী হন। ভালো কবি বা কথাশিল্পী হলে তিনি গুণী হন। কিন্তু যিনি সুললিত কন্ঠে বিশুদ্ধ উচ্চারণে পবিত্র তেলাওয়াতে কুরআনের মাধ্যমে অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষকে মুগ্ধ করেন সেই ক্বারী কি গুণী নন? দেশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে, সবাই গুণী শুধুমাত্র তাঁরা ব্যতিত, যারা আলেমে দ্বীন, হাফেজে কুরআন, মুফতি, মুহাদ্দিস, ইসলামী সাহিত্যিক, ইসলামী স্কলার এবং কুরআনের ক্বারী! তারা গুণী ব্যক্তি নন। যদি তা না হয় তাহলে দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ আর্ন্তজাতিক ক্বারী ওবায়দুল্লাহর খোঁজ-খবর রাখছেন না যে কেউ?

বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে কুরআনের এ ক্বারী সুমধুর কন্ঠে বিশুদ্ধ তেলাওয়াত ও আজানের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের অগণিত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে মোহিত করেছিলেন, কিন্তু আজ তিনি মানবেতর দিনাতিপাত করছেন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিক এবং কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ক্বারী উবায়দুল্লাহ ২০০০ সালে প্রথমবারের মত হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ওই সময় চিকিৎসা করার পর তিনি সুস্থ হন। এর ছয় বছর পর ২০০৬ সালে ঢাকার বাইরে একটি ওয়াজ মাহফিলে যাওয়ার সময় পান্থপথ এলাকায় ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হলে তাকে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে দু’মাস চিকিৎসা নেন তিনি। এসময় চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে তাকে ভারতের কলকাতায় নিয়ে এএমআরআই হাসপাতালে অধ্যাপক জিকে পুস্তির তত্ত্বাবধানে ১৫ দিন চিকিৎসা দেয়া হলে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে চলাফেরা করতে শুরু করেন তিনি। দু’বছর পর ২০০৮ সাল থেকে পরপর তিন বছর ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হন। দু’বছরপর ২০১২ সালে সর্বশেষ ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তখন থেকেই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের বাসায় অসুস্থ অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন তিনি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালেই সরকার ক্বারী উবায়দুল্লাহকে থাকার জন্য একটা বাড়ি বরাদ্দ দেয়। তাকে চকবাজার মডেল থানার চাঁদনীঘাট এলাকার গৌর সুন্দর রায় লেনের ৩৩/৩৭ নম্বর বাড়ির সাড়ে ৮ কাঠার মধ্যে ৪ কাঠা জমির বন্দোবস্ত দেয়া হয়। এই বাড়িতেই ২ স্ত্রী, ২ ছেলে ও ৬ মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন ক্বারী উবায়দুল্লাহ। বিভিন্ন সরকারের সময়ে বাড়ির বরাদ্দ পাওয়া অংশটি তার নামে সাব-কবলা দলিল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর তা করেনি। এর মধ্যেই বরাদ্দের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। এই সুযোগে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গেজেটভূক্ত বাড়িটি মামলা ও জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে নেয় স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। সেখানে একটি বহুতল বাড়ির নির্মাণ চলছে। অন্যদিকে বৃদ্ধ বয়সে গৃহচ্যুত হয়ে পথে দাঁড়ানো ক্বারী উবায়দুল্লাহ বাধ্য হয়ে মূল ঢাকা শহর ছেড়ে বুড়িগঙ্গার ওপারে কামরাঙ্গীরচরে চলে যেতে হয় তাকে। কামরাঙ্গীরচরের নিজামবাগ এলাকার মাতবর বাজারে স্ত্রীর নামে কেনা জমিতে শাশুড়ির নামে প্রতিষ্ঠিত আক্তার বানু নূরানী মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসার ভবনেই এসে আশ্রয় নেন ক্বারী উবায়দুল্লাহ ও তার স্ত্রী। ইতোমধ্যে ছেলে ও মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত আছেন। অনেক কৃতিত্বের অধিকারী হলেও মাত্র ৭১ বছর বয়সেই ভেঙে পড়েছেন ক্বারী উবায়দুল্লাহ।
 (২৮মে’১৫-সময়বার্তা টুয়েন্টিফোর ডট নেট)

ক্বারী উবাইদুল্লাহ শুধু একটি নাম নয়ম তিনি এই দেশের সম্পদ। ১৯৬৫ সালে শুরু হওয়া পাকিস্তান টেলিভিশন যত দিন ছিল ততদিন ক্বারী উবায়দুল্লাহ সুমধুর কন্ঠ দিয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষকে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ বেতারে প্রথম যে তেলাওয়াতে কুরআনের সুর ধ্বনি বেজে উঠল সেটিও কারী উবায়দুল্লাাহর কণ্ঠে, ‘জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফিহ’। ক্বারী উবায়দুল্লাহর তেলাওয়াতের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালে বিটিভি উদ্বোধন হয়েছিলো। বাংলাদেশ পার্লামেন্টের সেই উদ্বোধনী অধিবেশন থেকে ৯ম পার্লামেন্ট পর্যন্ত আমাদের জাতীয় সংসদসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানসমুহকে কুরআনের মধুর তেলাওয়াতে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন তিনি।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, নিউমার্কেট, হোটেল শেরাটনসহ জাতীয় অসংখ্য স্থাপনার উদ্বোধন হয়েছে তার তেলাওয়াতের মাধ্যমে। তার যাদুকরি কন্ঠে কোরআনের তেলাওয়াত করে দেশও জাতির জন্য বয়ে এনেছেন বিরল সম্মানও মর্যাদা । কারী উবায়দুল্লাহ সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, লিবিয়া, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অন্তত ২০-২৫টি দেশে আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বারবার প্রথমস্থান অর্জন করে বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনেন বিরল মর্যাদা। সৌদি বাদশাহ ফয়সাল ও খালেদ দুইবার তাকে কোরআনের শিল্পী বা কারী হিসেবে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন। কারী উবায়দুল্লাহর সুমধুর তেলাওয়াত বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকেও প্রায় জুমাবার টেনে নিয়ে আসত চকবাজার শাহী মসজিদে। নামাজের পর শেখ মুজিব কারী উবায়দুল্লাহর বুকে বুক লাগিয়ে কারীকে সম্মান করতেন এবং নিজেও সম্মানিত হতেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন কারী উবায়দুল্লাহর ছাত্র। তিনি দীর্ঘদিন তার কাছে কুরআন শিক্ষা করেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন জেনারেল জিয়া কখনও কখনও শুধু কুরআন তেলাওয়াত শোনার জন্য তাকে বঙ্গভবনে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসতেন।
(-বুধবার, ২৮মে’১৫, দৈনিক ইনকিলাব)

ক্ষণজন্মা এই কারীর তিলাওয়াতের সুনাম ও সূরশিল্পের কথা হয়তো আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু এর বাইরেও তিনি তাকওয়া ও ইখলাসে পূর্ণ একজন মহান ব্যক্তিও। এত এত কৃতিত্বের অধিকারী কিন্তু তাঁর মাঝে নেই কোন ধরণের অহঙ্কার। সাদা মনের সহজ-সরল ইখলাসপূর্ণ একজন আলেম তিনি। মানুরাজধানীর মাদরাসায়ে দারুর রাশাদে একবার কারী উবায়দুল্লাহকে বুখারী শরীফের উদ্বোধন উপলক্ষে আমন্ত্রণ করা হলো। তিনি উপস্থিত হয়ে তিলাওয়াত করলেন। অনুষ্ঠান শেষে বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সালমান নদভী তাঁকে হাদিয়ে দিতে চাইলেন। তিনি উল্টা নিজের পকেট থেকে ৫০০টাকার দু'টি নোট বের করে মাদরাসার জন্য দান করলেন। এছাড়াও অনেকে আলেমদের কাছ থেকে শুনেছি তিনি মাদরাসার কোন প্রোগ্রামে অতিথি হয়ে আসলে সাধারণত টাকা পয়সা নিতেন না। বরং উল্টে দান করে আসতেন। দেশ-জাতির কল্যাণে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন নিবিষ্টভাবে। মুখলিস এই ক্বারী টাকা কামাই বা রুজি-রুটির জন্য কোনরূপ ধান্ধা করেন নি কখনো। সেই মহান গুণী, কুরআনের ক্বারী ৯ বছর যাবত প্যরালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আগের মতো সেই সুর নেই তার কণ্ঠে। কথা বলেন হাতের ইশারা-ইঙ্গিতে। কেউ ক্বারী উবায়দুল্লাহর দু:সময়ে কেউ তার খোঁজ খবর নিচ্ছে না। দেশে গানের শিল্পীসহ নানা ক্ষেত্রের মানুষের অসুখে-বিসুখে গণমাধ্যম ও সুধীজনের ব্যাপক সংবেদনশীল আচরণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের কুরআনের কারীর প্রতি এত অবহেলা! এ লজ্জা কি দেশের নয়? কিন্তু এখন কেউই তাঁর খোঁজ-খবর রাখছে না! সরকার-বিারোধী দলের কথা আপতত না হয় বাদই দিলাম, ওলামায়ে কেরাম এবং কুরআনপ্রেমিকরা অন্তত তাঁকে স্মরণ রাখা উচিত ছিলো। গুনী এই মানুষটি রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের এক জীর্ণ কুটিরে কোন রকম জীবিতাবস্থায় দিনাতিপাত করছেন! কিন্তু ওখানে তিনি ভাল নেই। ভাল থাকার সুযোগও নেই। এমনকি বেঁচে থাকার সুযোগও ক্রমে সংকুচিত হয়েআসছে। তাঁর বর্তমান অবস্থা মুসলিম উম্মাহর জন্যে অশেষ হতাশার। আফসোস! সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশে কুরআনের কারীর কোন মুল্য নেই!অপরদিকে আমাদের দেশে রয়েছে অনেক গুণীজন ও মেধাবী মানুষ। তাদের আমরা সম্মান করতে পারিনি। অনেক সময় দেখা গেছে যেখানে অর্থ ব্যায় করার প্রয়োজন নাই সেখানে অর্থ ব্যায় করি, অথচ মেধাবী, গুণী ব্যাক্তরা অনাহারে, অবহেলায়, বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের সামান্য অসুস্থ হলেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় উন্নত চিকিৎসা করা হয়, দেশে না হলে বিদেশে পাঠিয়ে হলেও সুস্থ করে তোলার তদবির করা হয়। আমাদের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে আমরা মেধাবী ও গুণীজনদের সম্মান করতে জানি না। কুরআনের কারী, দেশের বিশিষ্ট গুণী দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তাকে সুস্থ করে তোলার রাষ্ট্রীয় কোন উদ্যোগ নেই। অথচ এই কারীর তেলাওয়াত ছাড়া সংসদের একটি অধিবেশনও শুরু হতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ জিয়াউর রহমানও কারী উবায়দুল্লাহর তেলাওয়াতের ভক্ত শ্রেুাতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু আর শহীদ জিয়ার অনুসারী কেউই আজ তার খোঁজ রাখেছন না! যে কারীর তেলাওয়াতের আকর্ষণে কুরআনবিমুখ মানুষ কোরআনের আলোর পরশে ধন্য হয়েছে। আজ সেই মানুষ জীর্ণ কুঠিরে অন্ধকারে আচ্ছন্ন! যাই হোক অনেক সময় গড়িয়েছে এখনো নিভে যায়নি কুরআনের এই শিল্পীর প্রাণবাতি। এমন মহান মানুষের দায়িত্ব নেওয়াটা রাষ্ট্রের কর্তব্য। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। আসুন সকলে মিলে হযরতের পার্শ্বে দাড়ানোর চেষ্টা করি।

তিনি এবং তার পরিবার কারো সাহায্য নিতে চান না তার পরেও সরকারের প্রতি অনুরোধ বিদেশে নিয়ে হযরত কে উন্নত সিকিৎসা প্রদান করা হোক।

হে আল্লাহ, তোমার এই কোরআনের খাদেম কে শিফায়ে কামেলা আযেলা দান করুন- আমীন।
ছাঈদ কোদালাভী।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

আল্লামা শাহ্ মেহেরূজ্জামান (রহঃ)



সংক্ষিপ্ত কর্ম জীবনীঃ
- ছাঈদ কোদালাভী

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া থানার ১২ নং কোদালা ইউনিয়ন,
পূর্ব পশ্চিম ও দক্ষিনে সবুজে ঘেরা কোদালা চা বাগান এবং উত্তরে কাপ্তাই লেক ও সিতার পাহাড়ের ঝর্ণা হতে আবহমান কর্ণফুলী নদীর দক্ষিন কূল ঘেঁষে অবষ্হিত এ গ্রাম,
এটি একটি সম্পূর্ণ বিদআত ও শির্ক মূক্ত গ্রাম, নেই কোন বেদআত পন্হি মাদ্রাসা নেই কোন মাজার।

কোদালা কে খোদা ওয়ালা গ্রাম উপাধি দিয়ে ছিলেন পটিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পীরে কামেল আল্লামা শাহ মুপ্তী আজিজুল হক (রহঃ) কোদালার এমন কোন পাড়া নেই যেখানে হযরতের কদম পড়েনি।

এখানেই জন্ম গ্রহন করেছেন অনেক বুজুর্গানে দ্বীন ও যুগ শ্রেষ্ট আলেম,
তাদের মধ্যে আল্লামা শাহ মেহেরূজ্জামান (রহঃ) আল্লামা হাফেজ শাহ আহমদুর রহমান (রহঃ) মাওঃ আবদুল কাইয়ুম (নান সা'ব হুজুর রহঃ)  মাওলানা আবদুল কুদ্দুস (রহ) মাওলানা নুরূল হক সাহেব (রাইখালী) ও আন্তর্জাতিক ক্বারী মাওঃ ক্বারী ওবায়দুল্লাহ'র মতো বহু খ্যাতিমান ওলামায়ে কেরাম।

জন্ম ও ছাত্র জীবনঃ

এই গ্রামেই আল্লামা শাহ মেহেরুজ্জামান রহঃ ১৯০১ সালে জন্ম গ্রহন করেন, এবং রাঙ্গুনীয়ার চন্দ্রঘোনা হাজী পাড়া মক্তবে রাহে নাজাত পর্যন্ত প্রাথমিক ইসলামী শিক্ষা অর্জন করে চট্টগ্রাম জিরি মাদ্রাসায় চলে যান এবং সেখানে ৮ম শ্রেনী
(ছাহারুম) পর্যন্ত পড়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য হাটহাজারী আরবী বিশ্ব বিদ্যালয়ে গমন করেন, ওখান থেকে ১৯২৪ সালে দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) পাশ করে একজন সুদক্ষ আলেম ও বর্ষিয়ান বক্তা হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন।

কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসা নির্মানঃ

আল্লামা শাহ মেহেরূজ্জামান ও হাফেজ আহমদুর রহমান এরা দুজন ছিলেন মুপ্তী আজিজুল হক ( রহঃ) এর সুযুগ্য খলীফা, হাটহাজারী মাদ্রাসায় লেখা পড়া শেষে ওষ্তাদ স্বিয় ছাত্র মেহেরূজ্জামান কে নিজ গ্রামে একটি মাদ্রাসা ষ্হাপনের নির্দেশ দেন, ওষ্তাদের নির্দেশে ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্টা করেন কোদালা আজিজিয়া কাছেমুল উলুম মাদ্রাসা।

সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহনঃ

১৯৫৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৫ বছর যাবত কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসা পরিচালনা করার পর সেচ্ছায় চলে যান বাংলার ৬ষ্ট প্রাচীনতম মাদ্রাসা সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসায়, যে মাদ্রাসার গর্বিত ছাত্র খুদ শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি হাফিজাহুল্লাহ।
এখানেই তিনি পরিচালনার মহান দায়িত্ব পালন করেন প্রায় দির্ঘ্য ৪০ বছর।
(ঐ মাদ্রাসায় এ অধমের "ছাঈদ কোদালাভী'র" ৪ বৎসর খেদমত করার সুযোগ হয়েছিল)
সুদক্ষতার কারনে তিনি ওখানে খ্যাতি অর্জন করেন অনেক, রাঙগুনিয়ায় প্রসিদ্ধ হন মুহতম সা'ব নামে, মাঝ খানে একবার মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা হতে রাগ করে তিনি রাঙ্গুনীয়া ইছাখালী রহমানিয়া মাদ্রাসায় চলে যান এবং ৯ মাস পর্যন্ত ঐ মাদ্রাসার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, ৯ মাস পর সরফভাটার জনগন পুনরায় হুজুর কে মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসায় নিয়ে আসেন।

রাজনীতিঃ

তিনি যেমন বিজ্ঞ আলেম তেমন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ছিলেন, রাঙ্গুনীয়া থানা নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি ছিলেন অনেক বছর ধরে,
১৯৭০ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টি হতে বই মার্কা প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেন এবং আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাসেম এর কাছে পরাজিত হন।

শত বছরের শ্রেষ্ট শিক্ষার্থীঃ

১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম হাট হাজারী আরবী বিশ্ব বিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত "শত বার্ষিকী সমাবর্তন" অনুষ্ঠানে একশ বছরের ২০০ জন কৃতি ছাত্রদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ট শিক্ষার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।

বর্শিয়ান বক্তাঃ

তিনি যেমন একজন অাল্লাহর অলী তেমন একজন দ্বীনের দাঈ ও বটে আজীবন মানুষ কে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জুড়তে  দেশের প্রত্যান্ত এলাকায় বয়ান করতে যেতেন, এবং সকল মুসলিমদের ঐক্য করতে আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, ওহাবী সুন্নী বলে যারা মুসলমানদের ভাগ করতো তিনি তাদের পেট্য (পেটুক) ও ভাত্ত  মৌলভী বলে আখ্যা দিতেন, তিনি ওহাবী সুন্নী সকলের মাহফিলে বয়ান করতেন, এবং ধর্ম নিয়ে দলাদলি না করে সকল কে এক হয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আহবান করতেন।

মেহেরিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাঃ

জীবনের শেষের দিকে ১৯৯৬ সালে তিনি চলে যান মধ্যম সরফভাটা এবং সেখানে প্রতিষ্টা করেন মেহেরিয়া মুঈনুল ইসলাম নামক এক বিরাট মাদ্রাসা যেখানে আজ চালু হয়েছে দারসুল হাদীস বা দাওরায়ে হাদীস,
তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত আল্লাহর অলী রাসুেলর সুন্নাহর উপর ছিলেন আজীবন অটল,ঘুম ব্যতিত সর্বদা মাথায় থাকতো সুন্নাতের পাগড়ী,যেমন ছিলেন বুজুর্গ তেমন ছিলেন সৌখিন ঘোড়ায় চড়ে বয়ান করতে যেতেন, ওনার বয়ান ছিল খুবই যজবা পূর্ণ, প্রতি বছর পটিয়া মাদ্রাসার সালানা জলসায় ফজরের নামাজের পর বয়ান করতেন তিনি,
বয়ানে লাফিয়ে লাফিয়ে অনেক লোক বেহুশ হয়ে যেত, তিনি এই শেয়েরটা প্রায় বয়ানে রাসুলের মুহাব্বতে যজবার সাথে পড়তেন-
 محمد مصطفى نور على نور
شاه جن و ملك انس فريهون...
এবং নিজের ওস্তাদের কথা স্বরণ হলে প্রায় সময় এ শেয়েরটা পড়তেন- আর দোয়া করতেন-
بهر شيخى مرشدي شاه مفتي عزيزالحق ولي
بهرمولانا ضميرالدين خضرت غنغوهي.....

আজীবন মানুষ কে ডেকেছেন শান্তি ও ঐক্যের পথে, কন্ঠ ছিল সুমধুর।
ওনার ৬ ছেলে ও ২ মেয়ে, তাদের মধ্যে জনাব নেয়ামত উল্লাহ বি এস সি ও মাষ্টার হাবিবুল্লাহ এবং ৪ জন আন্তর্জাতিক মানের ক্বারী অন্যতম।
১- বাংলাদেশ সংসদ বেতার ও বিটিভি'র সাবেক প্রধান ক্বারী ঢাকা চকবাজার শাহী জামে মসজিদের সাবেক খতীব জনাব ক্বারী ওবায়দুল্লাহ,
২-  ক্বারী ফয়জুল্লাহ,
৩- ক্বারী রহিমউল্লাহ প্রধান ক্বারী ও শিক্ষকঃ মেহেরিয়া মাদ্রাসা,
৪- ক্বারী সাইফুল্লাহ ইমাম ও খতীব জামে ওসমান বিন আফ্ফান ইউ এ ই।
আজ রাংগুনিয়ার অধিকাংশ ঘরে ঘরে অসংখ্য আলেম হাফেজ ও ক্বারী সবি তারই অবদান।

তার লিখিত গ্রন্হঃ

১-আল্লাহর ভালবাসা কোন পথে?
২- রাসুলের ভালবাসা কোন পথে?
৩- ইসলামী রাজনীতির প্রয়োজন কেন?

তিনি ১৯৯৭ সালের ২২ শে ডিসেম্বর সোমবার দিবাগত রাত পৌনে তিনটায় অসংখ্যা ভক্ত ও ছাত্রদের কাঁদিয়ে নিজ মাওলার ডাকে সাড়া দেন, এবং তারই হাতে গড়া মেহেরিয়া মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা মাঠেই সমাহিত হন।

হে আল্লাহ, আপনি হুজুর কে ক্ষমা করে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন ,,,আমীন।

আল্লামা হাফেজ আহমদুর রহমান (রহঃ)



তার সংক্ষিপ্ত কর্ম জীবনী --- শাইখ ছাঈদ কোদালাভী

চট্টগ্রামস্হ রাঙ্গুনীয়া থানার কোদালা ইউনিয়নের দক্ষিন পাড়ায় তিনি জন্ম গ্রহন করেন। জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার মুপ্তী আজিজুল হক (রহঃ) এর একজন সুযোগ্য খলীফা আজিজি বাগের কাঁটা ছাড়া ফুল, সৈসব হতেই দ্বীনদার মুত্তাকী ছিলেন,কথা বলতেন কম সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মত্ত থাকিতেন, পড়া শোনার ফাঁকে ফাঁকে ওস্তাদের খেদমত করতেন, অলিকুল শিরূমনি যুগ শ্র্রেষ্ট আলেমে দ্বীন আল্লামা মুপ্তী আজিজুল হক (রহঃ) ছিলেন তার প্রধান ওস্তাদ, প্রাণের চেয়েও বেশি ভাল বাসতেন নিজ ওস্তাদ কে, পটিয়া মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করার পর নিজ ওস্তাদ মুপ্তী সাহেব হুজুর তাকে চন্দনাইশ বসরত নগর মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করেন, তৎকালীন বসরত নগর মাদ্রাসার মুহতামিম ছিলেন মুপ্তী আজিজুল হক (রহ) এর অপর খলীফা মাওলানা মফজল আহমদ (রহ) তিনিও এক আল্লাহর অলি ছিলেন, দুই পীর ভাই একি মাদ্রাসায় কিন্তু মাওলানা আহমদুর রহমানের মন কিছুতেই বসেনা, কি যেন হাঁরিয়ে ফেলেছে শুধু ওস্তাদের কথা মনে পড়ে,দিনের বেলায় ছাত্রদের পড়িয়ে বিকালে পাড়ি দিতো ওস্তাদের কাছে পটিয়া মাদ্রাসায়,তখনকার যুগে গাড়ি বা অন্য কোন যানবাহন ছিলনা হেঁটে হেঁটে চলে আসতেন অতটুকু পথ শুধু ওস্তাদের টানে, আমি অধম যখন কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসায় পড়তাম তখন প্রায় সময় হুজুর কে ছাত্রদের মসজিদে নসিহতের সময় বলতে শুনতাম, হুজুর কেঁদে কেঁদে বলতেন বসরত নগর মাদ্রাসায় আমার মন বসতনা আমার মনে হতো হুজুর কে তাহাজ্জদের সময় গরম পানী করে দেবে কে?  অজুর পানী কে ডেলে দেবে? এসব মনে উঠলে আমি আর থাকতে পারতামনা,পাগলের মতো ছুঠে যেতাম পটিয়া,মাওলানা আহমদুর রহমান (রহ) কোদালা মাদ্রাসার ছাত্রদের তাহাজ্জদ ও জিকিরের তাকিদ করতে গিয়ে পটিয়ার মুপ্তী সাহেব (রহ) এর জিকিরের বর্ণনা দিয়ে বলতেন -
হুজুর যখন জিকির করতেন তখন কোরবানীর গোস্ত সিদ্ব্ধের ন্যায় গব্ গব্  আওয়াজ দিতো, এসব কথা গোলো বলতেই প্রায় সময় বিকট শব্দে আওয়াজ দিয়ে মসজিদে হুজুর বেহুশ হয়ে যেতেন।

একদিন হঠাৎ পটিয়া মাদ্রাসায় এসে মুপ্তী সাহেবের রূমে গিয়ে হুজুর কে বললেন-
আমি আর চাকুরী করবনা আমি আবার এখানে ভর্তি হয়ে কোরআন মজীদ হেফজ্ করবো ছাত্রের আগ্রহ দেখে মুপ্তী সাহেব হুজুর আর না করলেন না।হুজুরের খেদমতে থেকেই  হাফেজ হলেন।
এ জন্য তিনি কোদালাতে হাফেজ সা'ব হুজুর নামে ও খ্যাত যেমন মাওলানা মেহেরূজ্জামান সাহেব মুহতম সা'ব নামে খ্যাত।

কোদালা মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে নিয়োগঃ

১৯৩৩-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর যাবত সুদক্ষতার সাথে কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসা পরিচালনার পর মাওলানা মেহেরূজ্জান সাহেব (রহ) কোদালা হতে সেচ্ছায় পূর্ব সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসায় চলে যায়, পরে কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসার পরিচালনার ভার দেয়া হয় কোদালা বারয়ের বাড়ীর মাওঃশফি সাহেব কে তিনি ৪ বছর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, বিভিন্ন কারনে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ হলেন,

১৯৬১ সালে তৎকালিন পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা শাহ ইউনুস ( হাজী সাব হুজুর রহঃ) এর সভাপতিত্বে মজলিসে শূরার মাধ্যমে সরফভাটার মাওলানা সোলতান সাহেব (রহ) কে মুহতামিম পদে নিয়োগ দেয়া হয়,
একি বছর হাফেজ মাওলানা আহমদুর রহমান (রহ) কেও কোদালা মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়।
এভাবে ২ বছর পরিচালনা করেন  মাওঃ সুলতান সাহেব (রহ)।

নায়েবে মুহহতামিম পদে নিয়োগঃ

২৫ শে মে ১৯৬৪ ইং ২৯ জিলক্বদ্ ১৩৮০ হিজরী
মজলীসে শূরার আহবান
সভাপতিঃ জিরি মাদ্রাসার তৎকালিন মুহতামিম পীরে কামেল আল্লামা শাহ আহমদ হাসান (রহ)
অধিবেশনে মাদ্রাসা পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম এর উপর ন্যাস্ত করা হয়,
এবং হাফেজ মাওঃ আহমদুর রহমান কে নায়েবে মুহতামিম হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়,
তিনি ছিলেন আধ্যাত্বিক ইলমের অধিকারী, আল্লাহর প্রতি ছিল তার পূর্ণ আষ্হা, নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন কোদালা মাদ্রাসার জন্য, কোন দিন কারো কোন প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়নি উনাকে,দিন দিন ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি হতে লাগলো কিন্তু মাদ্রাসায় খাদ্যের অভাব কখনো দেখা যায়নি, কোন বড় ধরনের মিটিং বা শূরার প্রয়োজন ও হয়নি,
তিনি ১৯৬৪ - ১৯৯৩ পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর যাবত নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও নিষ্টার সাথে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

উনি যে সহকারী পরিচালক তা ৩০ বছর যাবত কেউ কল্পনাও করতে পরেনি সবাই জানতো তিনিই মুহতামিম,
উনার কর্ম দক্ষতা, সততা,আন্তরিকতা এবং মাদ্রাসার প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালবাসা দেখে সবাই মুগ্ধ।

ষ্হায়ী মুহতামিম পদে নিয়োগঃ

৩১ আগষ্ট ১৯৯৩ ইং ১৩ রবিউল আওয়াল ১৪১৪ হিজরী আল্লামা শাইখ হারূন ইসলামাবাদী (রহ) এর সভাপতিত্বে অনুষ্টিত মজলিসে শূরা'র অধিবেশনে হুজুর কে ষ্হায়ী মুহতামিম ঘোষনা করা হয়।
৭ ই এপ্রিল ২০০৬ সাল শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় ৪৩ বছর যাবত কোন এস্কাল বিহিন  পরিচালনার এ মহান দায়িত্ব পালন করে যান তিনি,দিন দিন মাদ্রাসা ও ছাত্রদের লেখা পড়ার উন্নতি সাধিত হয়, দেশ ব্যাপী লেখা পড়ায় সুনাম অর্জন করতে থাকে, মাওলানা আইয়ুব সাহেব (রহ) ছিলেন তখনকার কোদালা মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক, আজকের কোদালা মাদ্রাসার মুহতামিম ইলমের সাগর  আলহাজ আল্লামা মুপ্তী আবদুল কাদের ( হাফিজাহুল্লাহ) এর মতো হাজারো আলেম তাদেরই হাতে গড়া।

তিনি স্বপরিবারে দক্ষিন পাড়া হতে কোদালা মাদ্রাসার পার্শ্বেই বসতি স্হাপন করেন, তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় মসজিদেই কাটিয়েছেন, রাত্রে অতি অল্প সময় তিনি বাড়িতে আরাম করতেন।
 তিনি বেশী কথা পছন্দ করতেন না সারাক্ষন মসজিদের বারিন্দায় বসে কোরআন মজীদ তেলাওয়াত করতেন, ছাত্রদের ক্লাস ও করাতেন একি স্হানে।
নম্রতা ও স্বভাবঃ
তিনি ছিলেন অত্যান্ত নম্র ও শান্ত স্বভাবের লোক,ছাত্রদের নসিহতের সময় প্রায় ওনার পীর ভাই বোয়ালবী সাহেব হুজুরের উদ্বৃতি দিয়ে বলতেন " আমার নিচে নিচ নেই আমার পরে পর নেই"
চলার সময় সব সময় নজর থাকতো নিছের দিকে, নফস (দিল) কে সব সময় দমন করতো,
 তিনি রাত তিনটায় চলে আসতেন মাদ্রাসায়, অনেক সময় হুজুর কে ছাত্রদের ডাকার আগে মাদ্রাসার পশ্চিম দক্ষিন দিকে ছাত্র শিক্ষকদের তখনকার টিনের বাথরূম গূলো পরিষ্কার করতে দেখা যেতো, পুকুর হতে বালতিতে করে পানী এনে বাথ রূমে মারতেন এবং নিজের পা দিয়ে তা পরিষ্কার করতেন,  তাহাজ্জদের জন্য ছাত্রদের ডেকে দিয়ে মসজিদে তাহাজ্জদ আদায় করে লেগে যেতেন আপন মাওলার জিকিরে, এমন ভাবে জিকির করতেন আওয়াজ মাদ্রাসা ছেড়ে পুরা এলাকায় ছড়িয়ে যেত, ওনার জিকিরে আল্লাহ শব্দ টা দুই রখম আওয়াজে বের হতো, জিকিরের পরে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতেন।

তাকওয়াহঃ
হুজুর নিজের কাপড় গূলো নিজেই ধুইতেন, সব সময় মসজিদের কোনায় একটি সাদা লুঙ্গি থাকতো প্রত্যহ নামাজের পূর্বে কাপড় বদল করেই নামাজ পড়তেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে  রাসুল (স) এর সুন্নাতের উপর ছিলেন অটল,মিসওয়াক ও পাগড়ী ছিল নিত্ত সঙ্গী,পরিবার অসূষ্হ হলে বাড়ির সব কাজ নিজেই করে দিতেন, নিজ হাতে কাপড় কেঁচে দিতেন।
হজুর বয়ান করতে পারতেন না ৫/১০ মিনিট বয়ান করার পর কবর হাসরের কথা বলতেই কাঁদতে কাঁদতে বেহূশ হয়ে যেতেন পরবর্তিতে ডাক্তারগণ বয়ান করতে নিষেধ করে দেন, তাই সাধারণের মাঝে অত প্রসিদ্ধতা লাভ করেনি।

হুজুরের অনেক কারামত ও অজানা ঘঠনা রয়েছে লিখতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে, সুযোগ হলে কোন দিন ইনশা আল্লাহ কাগজেই লিখবো।

তিনি আমাদের মাঝে সুন্নাতের এক আলোকোজ্জল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন, স্মরণীয় হয়ে থাকবেন লক্ষ লক্ষ ছাত্র ও ভক্তদের হৃদয়ে।

ইন্তেকালঃ

তিনি গত ৭ ই এপ্রিল ২০০৬ বাদে জুমা সকল কে ছেড়ে মাওলার রহমতের ডাকে সাড়া দেন, এবং কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসার জামে মসজিদের দক্ষিন পার্শ্বে সমাহিত হন।
মৃত্যূকালে তিনি তিন ছেলে (১) হাফেজ মুহিব্বুল্লাহ (২) হাফেজ এমদাদ উল্লাহ (৩) হাফেজ আজিজ উল্লাহ ও তিন মেয়ে সহ অসংখ্যা ভক্ত ও ছাত্রদের সদকায়ে জারিয়া স্বরূপ রেখে যান।

হে আল্লাহ তুমি আমাদের হুজুর কে তোমার রহমতের চাদর দিয়ে ঘিরে রেখো এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করো---- আমীন।